Null


শহীদ আব্দুল আযীয রান্তিসি (রহঃ) এর জীবনী



"ফিলিস্তিন আমাদের ঈমানের অংশ। খলিফাতুল মুসলিমিন উমর(রা) এ ভূমিকে মুসলিমদের জন্য ঘোষনা করেছিলেন। তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর এ অধিকার নেই যে এই মহান পূণ্যভূমি কারো কাছে বিক্রি করে দিবে বা কারো হাতে তুলে দিবে।"
- আব্দুল আজিজ আলী আব্দুল হাফিজ আল-রন্তিসি ওরফে আবু মোহাম্মদ।
(যিনি শেখ আহমদ ইয়াসিনের শাহাদাতের পর ফিলিস্তিন মুক্তি আন্দোলন হামাসের নেতৃত্বদানকারী ও হামাসের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য)

জন্ম ও শৈশব:
শহীদ রানস্তিসির জন্ম ২৩ অক্টোবর ১৯৪৭ সালে, ইবনা গ্রামে। ১৯৪৮ সালের যুদ্ধের পরে তার পরিবার গাজা উপত্যকায় আশ্রয় নিয়েছিল এবং খান ইউনুসের শরণার্থী শিবিরে বসতি স্থাপন করেছিল। সে সময় তিনি সেখানে ছয় মাস ছিলেন।

শিক্ষা:
ড রান্তিসি UNRWA তে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন এবং এই সময়ে তিনি তার পরিবারের খাদ্যের যোগান দিতে পড়াশুনার পাশাপাশি কাজ করতে বাধ্য হন। তিনি ১৯৬৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করেন এবং ১৯৭২ সালে আলেকজান্দ্রিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিশু বিশেষজ্ঞের উপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
ড রান্তিসি ১৯৭৬ সালে খান ইউনিস নাসের হাসপাতালে চিকিৎসক হিসাবে কাজ করেছিলেন এবং ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে গাজার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান, জিনেটিক্স এবং পরজীবীবিদ্যায় প্রভাষক হিসাবেও কাজ করেছিলেন।
তিনি ইসলামিক কম্পাউন্ড সংস্থার প্রশাসনিক সদস্য, গাজা উপত্যকায় আরব মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য এবং ফিলিস্তিনিদের রেড ক্রিসেন্টের সদস্য সহ বেশ কয়েকটি পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।

হামাস প্রতিষ্ঠা:
"আমাদের যাত্রা নিরবিচ্ছিন্ন। আমাদের পথ বড়ই কঠিন। কিন্তু এই একমাত্র পথই আমাদেরকে প্রত্যাশিত বিষয় পর্যন্ত পৌঁছে দিবে। তাই দূর্বলতা, নীতিস্বীকার ও হীনমন্যতার কোনো অবকাশ নাই।"

তিনি যখন মিশরে তাঁর স্নাতকের জন্য পড়াশোনা করছিলেন তখন তিনি ফিলিস্তিনি বুদ্ধিজীবী ইব্রাহিম মাকাদমেহের হাতে মুসলিম ব্রাদারহুড দলে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি খান ইউনুসে মুসলিম ব্রাদারহুড শাখার নেতৃত্ব আসার আগে ১৯৭৬ সালে মুসলিম ব্রাদারহুডে আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে, তাঁর এবং শহীদ শেখ আহমেদ ইয়াসিনের নেতৃত্বে ১৯৮৭ সালের ডিসেম্বরে ইসলামী প্রতিরোধ আন্দোলন-হামাসের প্রতিষ্ঠা লাভ করে।
তিনি প্রথম ইন্তিফাদার শুরু থেকেই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সংগ্রামে যোগ দিয়েছিলেন, যার জন্য তাকে জায়নিস্ট কারাগারে দুবছরের সাজা ভোগ করতে হয়েছিল।
শেখ আহমেদ ইয়াসিন শহীদ হওয়ার পর তিনি ২৩ শে মার্চ, ২০০৪ এ ফিলিস্তিনের অভ্যন্তরে হামাসের নেতৃত্বে ছিলেন। তিনি আশদোদ অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন।

সাহিত্য - সাংস্কৃতির চর্চা:
যদিও তিনি শিশু বিশেষজ্ঞ ছিলেন এবং রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকতেন এর মাঝেও তিনি ছিলেন একজন সৃজনশীল রাজনৈতিক ও সাহিত্যিক। আমান পত্রিকা, জর্দানীয় সাবিল পত্রিকা, আলবায়ানের এমিরতি পত্রিকা এবং আলওয়াতানের কাতারি জার্নাল সহ আরও কিছু আরব সংবাদপত্র ড রান্তিসির লেখাগুলি প্রকাশ করত। পাশাপাশি তিনি তাঁর ওয়েবসাইট ও অন্যান্য মিডিয়া প্ল্যাটফর্মেও তাঁর লেখা প্রকাশিত হতো।

মহান নেতা কারাগারে কুরআন মুখস্থ করেছিলেন এবং "আত্ন কথন(Self Talk)" সহ অনেক কবিতাও লিখেছিলেন যেগুলো ইস্রায়েলি দখলদারিত্বে বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামের পথে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতার সাথে কাজ করতে উৎসাহী করে।

কারাবাস ও নির্বাসন:
"যারা জালেমের সামনে মাথা উঁচু করার শিক্ষা দেয়না, তারা আল্লাহর সামনে মাথা নিচু করার শিক্ষাও দিতে পারেনা"

ইস্রায়েলীয় দখলদার কর্তৃপক্ষকে কর না দেওয়ার অভিযোগে ১৯৮৩ সালে প্রথম আল-রান্তন্সিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
৯ ডিসম্বের ১৯৮৭’র সেই রক্তে আগুন লাগানো জ্বলাময়ী প্রথম ইন্তিফাদা ডাক দেওয়ার পর প্রথম হামাস নেতা হিসেবে তাকে নির্বাসিত করা হয় । ১৫ জানুয়ারি ১৯৮৮ তেও তিনি ২১ দিনের জন্য নির্বাসিত হয়েছিলেন । তিনি তৃতীয়বারের মতো ১৯৮৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি গ্রেপ্তার হন এবং ইহুদিবাদী দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিকূল কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার অভিযোগে ইস্রায়েলি জেলখানায় ৩০ মাস বন্দী ছিলেন। ১৯৯০ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তাকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তবুও, ১৪ ডিসেম্বর, ১৯৯০ এ আবার তাকে আবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল এবং এক বছর প্রশাসনিক নির্বাসনে ছিলেন।

১৭ডিসেম্বর,১৯৯২ ইস্রায়েলি দখলদাররা তাকে হামাস এবং ইসলামিক জিহাদের ৪০০ মুজাহিদকে দক্ষিণ লেবাননের মার্জ আল-জোহুরে জোর পূর্বক স্থানান্তরিত করে। তিনি উচ্ছেদকারীদের মুখপাত্র ছিলেন যারা লেবাননের সীমান্তে এই অবৈধ উচ্ছেদের বিরেরাধীতা করেেআপন ভূমিতে ফিরে যেতে জায়োনিস্টদের উপর চাপ সৃষ্টির জন্য একটি বিক্ষোভ সমাবেশ করেছিল (যা ১৯৯২ এর গণ-প্রর্তাবর্তন নামে পরিচিত)। আল-রান্তেসি নির্বাসন থেকে ফিরে আসার পরে আইওএফ(IOF)তাকে আটক করে এবং ১৯৯৭সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত তাকে আটক করে রেখেছিল। তিনি ইসরায়েলি কারাগারে মোট ৭ বছর অতিবাহিত করেছিলেন।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ১৯৯৯ সালে আল-রন্তিসিকে আটক করেছিল এবং মায়ের জানাযার জন্য তাকে মুক্তি পাওয়র আগে তিনি ১৫ মাস কারাভোগ করেছিলেনে।এরপর তিনি পিএএ দ্বারা আরো তিনবার কারাবন্দি হয়েছিলেন।কারাগারে তিনি অনশন কর্মসূচীতে যাওয়ার পরে এবং কেন্দ্রীয় কারাগারের যে আবদ্ধ কক্ষে তাঁকে বন্দি করা হয়েছিল সেখানে (IOF)আইওএফের বোমা ফেলার পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয় ।
আল-রান্তেসি ২৭ মাস পি.এ.এর জেলিখানায় বন্দি ছিলেন।

ব্যর্থগুপ্ত হত্যাচেষ্ঠা :
আইওএফ প্রথমবার আল-রন্তিসিকে হত্যার চেষ্টা করেছিল ১৯৯২ সালের রমজানে মার্জ আল-জোহরের মিডিয়া তাঁবুতে। একজন ব্যক্তি জাপানী সাংবাদিকের অনুবাদক হিসাবে ভান করে আসে এবং গোপনে ঐ তাঁবুতে একটি বিস্ফোরক ব্যাগ রেখেছিলেন, যা পরে বিস্ফোরিত হয়। ভাগ্যক্রমে, যখন ব্যাগটি বিস্ফোরিত হয় তখন তাঁবুটি খালি ছিল এবং কোনও হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
আইওএফ ২০০৩ সালের ১০ ই জুন তাকে আবার হত্যার চেষ্টা করেছিল। তার দেহরক্ষী মোস্তফা সালেহ শহীদ হন এবং তার ছেলে আহমেদ এবং একজন পথচারী মহিলা ও ছোট মেয়েটি গুরুতর আহত হয়।

শাহাদাত:
ডাঃ আবদেল আজিজ আল-রন্তিসি একবার গণমাধ্যমের সাক্ষাৎকারে মৃত্যুর বিষয়ে উনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো-
"আপনি কি বিছানায় শুয়ে থেকে মরতে চান, নাকি এপাচি হেলিকপ্টারের গুলিতে?
-মৃত্যুর জন্য আমি এপাচি হেলিকপ্টারের গুলিকেই প্রাধান্য দিবো।”

আল্লাহ তায়ালা বলেন: মুমিনদের মধ্যে কেউ কেউ আল্লাহর সাথে তাদের করা অঙ্গীকার পূর্ণ করেছে, তাদের কেউ কেউ (অঙ্গীকার পূর্ণ করে) মারা গেছে এবং কেউ কেউ প্ৰতীক্ষায় রয়েছে। তারা তাদের অঙ্গীকারে কোন পরিবর্তন করেনি। (সূরা আহযাব: ২৩)
মহান আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা কবুল করেছেন। ১লা এপ্রিল ২০০৪-এ ইস্রায়েলীয় আপাচি গাজার জালার স্ট্রিটে যাওয়ার সময় তার গাড়িতে তিনটি রকেট ছুঁড়েছিল। এতে তার দেহরক্ষী আহমেদ আলগোরা এবং আকরাম নাসারও শহীদ হন।

ড আল রান্তিসির জানাজায় প্রায় অর্ধ মিলিয়ন ফিলিস্তিনি অংশ নিয়েছিল, এটি ছিল এক বণার্ঢ্য শোকযাত্রা যা শিফা হাসপাতাল থেকে জানাযার জন্য বড়-ওমারি মসজিদে যাত্রা করেছিল। ফিলিস্তিনি দলগুলির অনেক নেতৃবৃন্দ এবং হামাস নেতৃবৃন্দ এই জানাজায় যোগ অংশ নিয়েছিলেন।

অনুবাদকঃ মু. সায়েম মুহাইমিন

Comments

Archive

Contact Form

Send